যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইরাক। বাগদাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটন সফর করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালালেও, দেশের অভ্যন্তরে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান হুমকি ইরাকি সরকারকে এক চরম কূটনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে ইরাক এখন এক নাজুক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
সংক্ষেপে যা জানা গেছে
- ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি ওয়াশিংটন সফর করেছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে।
- ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছে।
- বাগদাদ সরকার একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তা এবং বিনিয়োগ ধরে রাখার চাপে রয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।
- এই সংকট ইরাকের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সম্প্রতি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ইরাকের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, মার্কিন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা নিশ্চিত করা। তবে এই সফরের সময় ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল বেশ উত্তপ্ত।
বাগদাদের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে থাকা ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গ্রুপগুলো প্রকাশ্যে মার্কিন উপস্থিতির বিরোধিতা করছে। তারা ইরাকি ভূখণ্ড থেকে মার্কিন সেনাদের বহিষ্কারের দাবিতে সোচ্চার এবং প্রয়োজনে সংঘাতের হুমকি দিচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইরাকি সরকারকে এক অস্বস্তিকর অবস্থানে ফেলেছে। একদিকে ওয়াশিংটন চায় ইরাক যেন তাদের ওপর নির্ভরশীলতা কমায় এবং মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকে, অন্যদিকে তেহরান চায় না ইরাক আমেরিকার কৌশলগত বলয়ে পুরোপুরি চলে যাক। প্রধানমন্ত্রীর এই মার্কিন সফর সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষণ
ইরাকের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি এক ‘ডিপ্লোমেটিক টাইটরোপ ওয়াক’ বা রশির ওপর দিয়ে হাঁটার মতো। ঐতিহাসিকভাবেই ইরাক যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ছায়া যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যদি ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ওয়াশিংটন সরাসরি পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা ইরাকের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। আবার এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নিলে ইরাকে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, আল-সুদানির প্রশাসন যদি সুকৌশলে মধ্যপন্থা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশটি ফের চরম অস্থিতিশীলতার কবলে পড়তে পারে। ইরাকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা কতটা দক্ষতার সাথে ওয়াশিংটনের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং তেহরানের সাথে রাজনৈতিক সখ্যতা বজায় রাখতে পারে তার ওপর। যেকোনো এক পক্ষে বেশি ঝুঁকে পড়া ইরাকের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সূত্র: aljazeera.com