বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান জানিয়েছেন, সরকার পরিচালনায় তিনটি বড় ধরনের দুর্বলতা বা ‘ফল্ট লাইন’ তৈরি হয়েছে যা ভবিষ্যতে বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে। এই দুর্বলতাগুলো মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতা, নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ না থাকা এবং সামাজিক স্বৈরতন্ত্রের উত্থান।
অধ্যাপক শাহানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার এমন এক সময় দায়িত্ব নিয়েছে যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সরকার সেই রাজনৈতিক পুঁজি ব্যবহারের বদলে আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চেয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে, যা নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের সাথে সরকারের কার্যকর যোগাযোগের অভাব রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নীতি প্রণয়নের প্রতিটি ধাপে জনগণের অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে স্বচ্ছ তথ্যের সরবরাহ না থাকায় সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে হতাশাজনক।
তৃতীয়ত, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একধরনের ‘সামাজিক স্বৈরতন্ত্র’ তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততায় তথাকথিত ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে কনসার্ট, সিনেমা বা নৌকাবাইচের মতো অনুষ্ঠান বন্ধের প্রবণতা বাড়ছে। এই কর্মকাণ্ডে সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্লেষক মনে করেন, সরকার এই সমস্যাগুলো নিরসনে একধরনের দ্বিধা ও অনিচ্ছা প্রদর্শন করছে। যদি দ্রুত এসব ‘ফল্ট লাইন’ সংশোধন না করা হয়, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরণের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।