যুক্তরাষ্ট্রের নাসা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে আমাদের একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের দূরত্ব প্রতিবছর ৩ দশমিক ৮৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে লুনার লেজার রেঞ্জিং পদ্ধতির মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা এই সত্য নিশ্চিত করেছেন। রাতের আকাশে স্থির মনে হলেও কোটি কোটি বছর ধরে চাঁদ পৃথিবী থেকে নিঃশব্দে দূরে সরে যাচ্ছে।
চাঁদের এই দূরত্ব মাপার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে বিশেষ আয়না বা রেট্রোরিফ্লেক্টর রেখে এসেছিলেন। বর্তমান সময়ে নিউ মেক্সিকো, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানির পর্যবেক্ষণাগার থেকে সেই আয়নায় লেজার রশ্মি পাঠিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই দূরত্ব পরিমাপ করা হয়। মানুষের হাতের নখ বাড়ার হারের মতোই চাঁদের এই দূরে সরে যাওয়ার গতি অত্যন্ত ধীর।
দূরত্ব বাড়ার মূল কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণকে দায়ী করেছেন। পৃথিবীর আহ্নিক গতি, চাঁদের মহাকর্ষ বল এবং মহাসাগরের পানির পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ায় পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি ধীরে ধীরে কমছে। কৌণিক ভরের সংরক্ষণ সূত্র অনুযায়ী, পৃথিবী তার ঘূর্ণন শক্তি চাঁদকে স্থানান্তরিত করছে, যার ফলে চাঁদ উচ্চতর কক্ষপথে উঠে যাচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার ফলে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, ১০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর একদিনের দৈর্ঘ্য ছিল ১৯ ঘণ্টা, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ২৪ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য ১ থেকে ২ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
দূরবর্তী ভবিষ্যতে এই পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে দৃশ্যমান প্রভাব পড়বে। চাঁদের আকার আকাশে ছোট হতে থাকায় আগামী ৬০ কোটি বছর পর থেকে পৃথিবী থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়া চাঁদের দূরত্বের ওপর নির্ভরশীল সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক চক্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে গবেষকরা আশঙ্কা করছেন।