ইসরায়েলের বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির উলম বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় কোয়ান্টাম জগতে আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী স্যার রজার পেনরোজসহ গবেষক দলটি প্রথমবারের মতো কোনো মুক্তভাবে পতনশীল কোয়ান্টাম বস্তুর ওপর মহাকর্ষের প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছেন। গত ২ সেপ্টেম্বর সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে পরিচালিত এই পরীক্ষাটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান মূলত দুটি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে—কোয়ান্টাম মেকানিক্স, যা ক্ষুদ্র পরমাণুর আচরণ ব্যাখ্যা করে এবং আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব, যা মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামোর ব্যাখ্যা দেয়। তবে এই দুটি তত্ত্বকে একটি একক কাঠামোর আওতায় আনা বিজ্ঞানীদের জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ।
পরীক্ষামূলক পদ্ধতি
গবেষক দলটি এই পরীক্ষার জন্য ‘কোয়ান্টাম গ্যালিলিও ইন্টারফেরোমিটার’ নামক একটি বিশেষ যন্ত্র তৈরি করে। বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রুবিডিয়াম পরমাণুকে পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি ঠান্ডা করে এই পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষকরা লেজার ও চুম্বকীয় ক্ষেত্রের মাধ্যমে একটি পরমাণুর কোয়ান্টাম তরঙ্গকে দুটি ভিন্ন পথে বিভক্ত করেন। এর একটি অংশকে স্থির রাখা হয় এবং অন্য অংশটিকে মহাকর্ষের প্রভাবে মুক্তভাবে পড়তে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দুটি তরঙ্গ পুনরায় একত্রিত করে দেখা হয় মহাকর্ষের প্রভাবে তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না।
ফলাফল ও তাৎপর্য
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মুক্তভাবে পতনশীল কোয়ান্টাম কণাটি ঠিক সেই পরিমাণ কোয়ান্টাম দশা (quantum phase) প্রদর্শন করেছে যা আইনস্টাইনের সমতুল্য নীতি (equivalence principle) অনুযায়ী প্রত্যাশিত ছিল। এই গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক রন ফোলম্যান জানান, এটি একটি অনন্য পরীক্ষা, যা মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে একীভূত করার পথে নতুন ইঙ্গিত প্রদান করেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভ্লাতকো ভেড্রাল বলেন, এই পরীক্ষাটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সকে মহাকর্ষের মতো জটিল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সুযোগ করে দিয়েছে এবং দেখিয়েছে যে আইনস্টাইনের তত্ত্ব কোয়ান্টাম আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই গবেষণা সরাসরি কোনো নতুন তত্ত্ব তৈরি করেনি, তবে এটি মহাকর্ষের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে নতুন আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে গবেষকরা আরও ভারী বস্তু, যেমন ন্যানোডায়মন্ড ব্যবহারের মাধ্যমে এই পরীক্ষাটি সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা করছেন, যা মহাবিশ্বের মৌলিক রহস্য উন্মোচনে সহায়তা করবে।