যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ওপেনএআইয়ের এআই প্রযুক্তি গণিতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ১০টি জটিল সমস্যার সমাধান করার পর বিশ্বজুড়ে গণিতবিদদের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ফিল্ডস মেডেল বিজয়ী গণিতবিদ জেমস মেনার্ডসহ বিশেষজ্ঞ মহলে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গণিতের মতো একটি ধীরগতির ও তাত্ত্বিক বিষয়ে এআইয়ের এমন দ্রুত আধিপত্যের ফলে এই ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ ও পেশাদার গণিতবিদদের কাজের সুযোগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের উদয় হয়েছে।
ওপেনএআই তাদের নতুন ও শক্তিশালী এআই মডেল ‘অস্ত্র’ (Astra) ব্যবহার করে এসব সমস্যার সমাধান করেছে। প্রযুক্তিটি বিপুল পরিমাণ তথ্যের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে নতুন নতুন সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম। এআইয়ের এই সক্ষমতাকে গণিতের গবেষণার গতি ত্বরান্বিত করার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে একই সঙ্গে গবেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা কাজ করছে যে, প্রযুক্তির এই উত্থান দীর্ঘদিনের শ্রমসাধ্য এই পেশার মানুষদের কোন দিকে নিয়ে যাবে।
উত্থাপিত সমাধানগুলোর মধ্যে গোলকের বিন্যাস, এরর-কারেক্টিং কোড এবং জটিল নেটওয়ার্কের গাঠনিক কাঠামোর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এআইয়ের এই ফলাফল প্রকাশের পর কিছুটা বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ‘নন-সফিগ গ্রুপ’ সংক্রান্ত একটি সমস্যার সমাধানের কৃতিত্ব নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে ওপেনএআই। গণিতবিদদের অভিযোগ, এআই নিজের প্রচারের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের মানবিক গবেষণার অবদানকে খাটো করে দেখিয়েছে। পরবর্তীতে ওপেনএআই তাদের ভাষ্য পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের কৃতিত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
গবেষকদের মতে, গণিত এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে এআইয়ের দাবিগুলো পুরোপুরি যাচাই করা কঠিন। যদিও ওপেনএআই ২৫০ পৃষ্ঠারও বেশি নথিপত্র প্রকাশ করেছে, তবে এর প্রভাব নিয়ে সংশয় কাটছে না। বিশেষ করে ছোট ও কম অর্থায়িত প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আধিপত্যের কারণে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন। এছাড়া গবেষণার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের এই অনুপ্রবেশ গণিতের উন্মুক্ত চর্চাকে ব্যাহত করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি গণিতবিদ ‘লেইডেন ডিক্লারেশন’ নামে একটি নীতিমালায় স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে এআইয়ের অতি-প্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে। তাদের ভয়, এআইয়ের এই তথাকথিত সাফল্য মানুষকে বিশ্বাস করাবে যে গণিতবিদদের আর প্রয়োজন নেই। তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। জেমস মেনার্ড ও কলভা রনি-ডুগালের মতো গবেষকরা বলছেন, এআইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফলগুলো আসলেই মৌলিক কি না, তা বুঝতে আরও সময়ের প্রয়োজন। গণিত কেবল সমস্যার সমাধান নয়, বরং নতুন প্রশ্ন ও ধারার জন্ম দেয়, যা এআই এখনো পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে এখনো সন্দেহ রয়ে গেছে।