বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে কমতে থাকা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বর্তমানে ঊর্ধ্বমুখী। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই এই হার বেড়েছে বলে সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে। প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন।
উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে প্রায় চার লাখ, মাদ্রাসায় ৬১ হাজার এবং কারিগরি বোর্ডে ৯০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। সাধারণ শিক্ষায় ৩৩ শতাংশ, মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ না করে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার বেড়ে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে ২০২৩ সালে এই হার ছিল ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছেলেদের ঝরে পড়ার হার মেয়েদের চেয়ে বেশি। এছাড়া মাধ্যমিক স্তরে ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, যার মধ্যে মেয়েদের হার তুলনামূলক বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও বড় একটি অংশ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মতে, দারিদ্র্য, পারিবারিক আর্থিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, বাল্যবিবাহ এবং শিক্ষাব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী সামাজিক অস্থিরতা ও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাবের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি এবং প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়ার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, ঝরে পড়া রোধে মাধ্যমিক পর্যায়ে নতুন করে একগুচ্ছ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝরে পড়া কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা প্রয়োজন।