ঢাকাWednesday , 29 July 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন ও বিচার
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইতিহাস
  5. খেলা
  6. খেলাধুলা
  7. চাকরি
  8. জাতীয়
  9. ধর্মীয় সম্প্রীতি
  10. পরিবেশ ও কৃষি
  11. প্রযুক্তি
  12. বিনোদন
  13. বিশেষ প্রতিবেদন
  14. বিশ্ব
  15. ভিডিও
আজকের সর্বশেষ সব খবর

মরক্কোর বু ইনানিয়া মাদ্রাসা: এক ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অজানা গল্প

Link Copied!

মরক্কোর ফেজ শহরের পুরোনো অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে তালাআ কাবিরা সড়কে দাঁড়ালে একটি দরজার সামনে এসে থামতে হয়। ঘোড়ার নালের আকৃতির সেই দরজা, তার চারপাশে খোদাই করা স্টাকো এবং ভেতরে সিডার কাঠের অসাধারণ কারুকাজ—সব মিলিয়ে মনে হয় এটি কোনো রাজপ্রাসাদের প্রবেশপথ। এটিই বু ইনানিয়া মাদ্রাসা, যা মরক্কোর একমাত্র মাদ্রাসা হিসেবে একসময় জুমার নামাজ আদায়ের মর্যাদা পেয়েছিল। বর্তমানে এই স্থাপত্যটি মারিনিদ যুগের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

মাদ্রাসার ইতিহাসের পেছনে একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার গল্প প্রচলিত আছে। চতুর্দশ শতকে মারিনিদ সাম্রাজ্য যখন শক্তির শিখরে, তখন সুলতান আবুল হাসানের রাজত্ব তিউনিস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৩৪৮ সালে তার নিজের পুত্র আবু ইনান ফারিস বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজেকে সুলতান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

পিতার বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহের গ্লানি আবু ইনানের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে। অনুশোচনায় কাতর সুলতান তখন আলেমদের শরণাপন্ন হয়ে মুক্তির পথ জানতে চান। আলেমরা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, শহরের কোনো ময়লার ভাগাড়ের জায়গায় একটি জ্ঞানভবন গড়ে তুলতে। এভাবেই একটি অপবিত্র স্থানকে জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে পবিত্র করে তিনি নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পেতে পারেন বলে ধারণা করা হয়।

যদিও এই ঘটনাটি ঐতিহাসিকভাবে পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবে ইসলামি দর্শনে সৎ কর্মের মাধ্যমে অতীত পাপ মোচনের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

“নিশ্চয়ই সৎ কর্মগুলো মন্দ কর্মগুলোকে দূরীভূত করে দেয়।” (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৪)

সুলতান আবু ইনান ফারিস সিংহাসনে বসার পর নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে এই বিশাল ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণে বিশেষ বিনিয়োগ করেছিলেন। মারিনিদদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। তৎকালীন সুন্নি অর্থোডক্স মতবাদের রক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে এবং প্রভাবশালী আলেমসমাজের সমর্থন আদায়ে মাদ্রাসাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মাদ্রাসার শিলালিপি অনুযায়ী, এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ৭৫১ হিজরির ২৮ রমজান এবং শেষ হয় ৭৫৬ হিজরিতে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা এই নির্মাণযজ্ঞে তৎকালীন হিসেবে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। একটি প্রচলিত আখ্যান অনুযায়ী, সুলতান আবু ইনান নির্মাণের খরচের হিসাব দেখে তা ছিঁড়ে ফেলে বলেছিলেন:

“যা সুন্দর, তা কখনো বেশি দামি নয়, খরচ যত বেশিই হোক।”

মাদ্রাসার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসত ওয়াক্‌ফ বা দাতব্য ট্রাস্ট থেকে। শিলালিপিতে সুলতানের উৎসর্গ করা এমন বহু সম্পত্তি ও আয়ের উৎসের বিবরণ পাওয়া যায়, যা প্রতিষ্ঠানটিকে সচল রেখেছিল। মাদ্রাসার উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত ইটের তৈরি মিনারটি এর জুমার নামাজের কেন্দ্র হওয়ার ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।

ভবনটির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মার্বেল পাথরে বাঁধানো একটি উঠান, যার মাঝে রয়েছে ফোয়ারা। উঠানের তিন পাশ ঘিরে থাকা সরু গ্যালারি এবং ওপরে ছাত্রদের থাকার কুঠুরিগুলো স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন। শ্রেণিকক্ষগুলোর গঠনশৈলী গবেষকদের মতে কায়রোর সুলতান হাসান মাদ্রাসার স্থাপত্যরীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

দেয়ালের নিচের অংশে রয়েছে জটিল জ্যামিতিক নকশার জেলিজ মোজাইক, যার ওপরে আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং স্টাকোর অলংকরণ শোভা পায়। এছাড়া কাঠামোর উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:

• জটিল জ্যামিতিক মোজাইক টাইলস
• আরবি ক্যালিগ্রাফির কারুকার্য
• আরাবেস্ক নকশা ও মুকারনাস
• খোদাই করা সিডার কাঠের ছাউনি

প্রার্থনাকক্ষের দিকে যাওয়ার পথে একটি ছোট্ট খাল রয়েছে, যার পানি ফেজ নদীর শাখা থেকে আসে। মাদ্রাসার বিপরীত দিকে অবস্থিত ‘দার আল-মাগানা’ বা ঘড়ির ঘরটিতে একসময় জলচালিত ঘড়ি ছিল, যার যান্ত্রিক রহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তৎকালীন পাঠ্যক্রমে মালেকি মাজহাবের ফিকহ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল:

• কোরআন ও ফিকহ শাস্ত্র
• ব্যাকরণ ও অলংকারশাস্ত্র
• যুক্তিবিদ্যা ও গণিত
• জ্যোতির্বিদ্যা

মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ আলেমরা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনও এই সময়কালে সুলতান আবু ইনানের অধীনে রাজকীয় ফরমান লেখার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এতসব আয়োজনের পরও বু ইনানিয়া তৎকালীন কারাউয়িন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জনে কিছুটা সীমাবদ্ধ ছিল।

বর্তমানে এই স্থাপনাটি আর কোনো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে না। ১৯৮১ সালে ইউনেসকো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। আজ এটি ফেজের প্রাচীন মেদিনার এক সংরক্ষিত অংশ, যেখানে অমুসলিম দর্শনার্থীরাও পরিদর্শনের সুযোগ পান। পর্যটকদের দেওয়া প্রবেশমূল্যেই সাত শতক পুরোনো এই ঐতিহাসিক কাঠামোটি টিকে রয়েছে।