ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস কিতাব কিংবা মাদ্রাসার চারদেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার সমান্তরালে সেখানে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ইমাম জাহাবির ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ বা ইমাম সামআনির ‘আল-আনসাব’-এর মতো জীবনীগ্রন্থগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, তৎকালীন অনেক মুহাদ্দিস, ফকিহ ও দার্শনিক একই সঙ্গে ছিলেন সফল ব্যবসায়ী।
মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে আলেমদের ব্যবসা-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ইসরায়েলি সমাজবিজ্ঞানী হাইয়িম জে কোহেন গভীর গবেষণা করেছেন। ইতিহাসবিদ অলিভিয়া রেমি কনস্টেবল তাঁর আন্দালুস বাণিজ্য-সংক্রান্ত গবেষণায় কোহেনের এই পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করেছেন। গবেষণায় হাজারো আলেমের জীবনী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যাঁদের পেশার বিবরণ পাওয়া যায়, তাঁদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
• টেক্সটাইল ও কাপড়শিল্প
• কৃষি ও শস্য উৎপাদন
• ধাতু ও জুয়েলারি
• সুগন্ধি ও চামড়া শিল্প
• বই-প্রকাশনা ও ব্যাংকিং
• সাধারণ বাণিজ্য
ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই বাণিজ্যের সঙ্গে সমাজের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। মক্কা নগরী ছিল তৎকালে একটি প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং পবিত্র কোরআনের সুরা কুরাইশে মক্কার কোরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য সফরের উল্লেখ রয়েছে। নবুয়ত-পূর্ব জীবনে মহানবী (সা.) খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের (রা.) বাণিজ্যিক প্রতিনিধি হিসেবে সিরিয়ায় ব্যবসা পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর অসাধারণ সততায় মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) তাঁকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেছিলেন। এ ছাড়া সাইব ইবনে আবি সাইবের সঙ্গেও মহানবী (সা.)-এর প্রাক-ইসলামি যুগে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
সাহাবিদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ও দানশীলতা ছিল প্রবাদপ্রতিম। খলিফা হওয়ার পরও আবু বকর সিদ্দিক (রা.) কিছুকাল কাপড়ের ব্যবসা চালিয়েছিলেন। তৃতীয় খলিফা ওসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) ছিলেন কোরাইশদের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়ী, যাঁর দানশীলতা ইসলামি ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর ব্যবসায়িক সফলতার গল্পও অনন্য। মদিনায় শূন্য হাতে হিজরত করে এসে তিনি ব্যবসার মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, সাহাবি জুবাইর ইবনুল আওয়াম তাঁর ঋণ পরিশোধের পর যে সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, তার পরিমাণ ছিল প্রায় পাঁচ কোটি দিরহাম।
তাবেয়ি যুগেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন একজন সফল রেশম ব্যবসায়ী। তাঁর সততা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতার গল্প আজও রূপকথার মতো শোনায়। একবার তাঁর পার্টনার কাপড়ের একটি খুঁত ক্রেতার কাছে জানাতে ভুলে যাওয়ায়, ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সেই পুরো চালানের বিপুল লভ্যাংশ দান করে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) এবং ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.)-এর মতো বড় মাপের মুহাদ্দিসরা নিজ নিজ ব্যবসার লাভ থেকে অভাবী আলেম ও দরিদ্রদের সহযোগিতা করতেন। ইমাম লাইস ইবনে সাদ (রহ.) ব্যবসায় থেকে অর্জিত বিপুল সম্পদ দিয়ে ইমাম মালিকের মাদ্রাসায় নিয়মিত অনুদান প্রদান করতেন।
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলেন,
“অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে শাসকদের ইচ্ছার কাছে আলেমদের নতিস্বীকার করতে হতো।”
হিজরি ষষ্ঠ শতকের চিন্তাবিদ ইমাম ইবনুল জাওজি তাঁর ‘সাইদুল খাতির’ গ্রন্থে আলেমদের অর্থনৈতিক পরাধীনতার কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, আলেমদের স্বাবলম্বী হওয়া জ্ঞানের মর্যাদা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। কারণ, অর্থনৈতিক পরাধীনতা সহজেই আত্মমর্যাদার সঙ্গে সমঝোতায় পরিণত হতে পারে। আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.) এ প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে বলতেন,
“আমি ব্যবসা না করলে এই ধনীদের দাস হয়ে যেতাম।”
চতুর্থ হিজরি শতকের বিস্ময়কর চরিত্রের অধিকারী ছিলেন মুহাদ্দিস দালাজ ইবনে আহমদ আস-সিজিস্তানি (মৃ. ৩৫১ হি.)। হাদিসশাস্ত্রে অনন্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন তৎকালীন অন্যতম ধনী ব্যক্তি। মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন লাখ স্বর্ণমুদ্রার সমান। মক্কা ও বাগদাদে তাঁর বিলাসবহুল বাড়ি ছিল, যা তাঁর অর্থনৈতিক সক্ষমতার জানান দেয়।
মুসলিম আলেমদের ব্যবসা ও জ্ঞানার্জনের সীমা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে আবদ্ধ ছিল না। স্পেনের ভালেন্সিয়ার মুহাদ্দিস সাদুল খায়ের আল-আনসারি আল-আন্দালুসি (মৃ. ৫৪১ হি.) বাণিজ্যের প্রয়োজনে স্পেন থেকে রওনা দিয়ে উত্তর আফ্রিকা, মিসর ও বাগদাদ হয়ে চীন পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন। এজন্যই তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘আল-সিনি’ বা ‘চীনের লোক’ উপাধি যুক্ত করতেন। ঐতিহাসিকদের মতে, মার্কো পোলো বা ইবনে বতুতার অনেক আগেই তিনি এই দূরপাল্লার যাত্রা সম্পন্ন করেছিলেন।
ব্যবসায় আলেমদের সততা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে, অনেক সময় তাঁদের পেশাই নামের অংশ হয়ে যেত। যেমন:
• আল-কাত্তান (তুলা ব্যবসায়ী)
• আল-বাজ্জাজ (কাপড় ব্যবসায়ী)
• আল-জাওহারি (জহুরি)
• আল-ওয়াররাক (বই ব্যবসায়ী)
শুধু ফকিহ বা শাস্ত্রীয় আলেমরাই নন, চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত পণ্ডিতরাও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দামেস্কের নুরি হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক জামালুদ্দিন আর-রাহবি (মৃ. ৬৫৮ হি.) ভেষজ ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম নিয়ে কায়রো ও দামেস্কের মধ্যে বাণিজ্য করতেন। এই বাণিজ্যিক সফরগুলো দুই অঞ্চলের চিকিৎসাবিদ্যা বিনিময়ের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। দামেস্কের ব্যাকরণবিদ আলি ইবনে সাইদ ইবনে দাব্বাবা (মৃ. ৫৬০ হি.)-এর ব্যবসায়িক সততার ঘটনা ইতিহাসবিদ জামালুদ্দিন আল-কিফতি তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আইয়ুবি সেনাপতি আসাদুদ্দিন শিরকুহর দরবারে ভুলবশত পাওয়া অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিতে গিয়ে তিনি যে নজির স্থাপন করেছিলেন, তা আজও বিরল। এসব ইতিহাস থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের স্বর্ণযুগে আলেমরা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো দরিদ্র গোষ্ঠী ছিলেন না। বরং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা তাঁদের জ্ঞানচর্চাকে শাসকদের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করেছিল।