বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে আবদুর রহমান জিদানের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘সে এক ফলের ঘ্রাণ’ পাঠক ও সমালোচকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। কবিতার উৎস সন্ধানে কবি এই গ্রন্থে স্মৃতি, ইতিহাস, পুরাণ, নদী, প্রেম এবং মৃত্যুসহ মানবজীবনের গভীরতর অনুষঙ্গগুলোকে একীভূত করেছেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর মানব-ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করাই এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কাব্যগ্রন্থটির বিভিন্ন কবিতায় পূর্বপুরুষের উপস্থিতি এক দ্বান্দিক আবহ তৈরি করে। কবি যখন আদি পিতামাতার উত্তরাধিকার নিজের শরীরে ধারণ করেন, তখন তা কাল অতিক্রান্ত এক অনুভূতির জন্ম দেয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো এখানেও অতীত ও বর্তমানের এক অদৃশ্য সংযোগ লক্ষ্য করা যায়, তবে জিদানের প্রকাশভঙ্গিতে নক্ষত্র, রক্ত, হাড় এবং পূর্বপুরুষের মিথস্ক্রিয়া অনেক বেশি দৃশ্যমান ও শরীরী।
পুরাণের ব্যবহার নিয়ে কবি নতুন ঘরানা তৈরি করেছেন। ‘অ্যান্ড্রোমাকে’ কবিতার মাধ্যমে তিনি ট্রয় যুদ্ধের ধ্রুপদী চরিত্রগুলোকে আধুনিক পৃথিবীর যুদ্ধ, বাজার ও লাশের স্তূপের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন। ডেরেক ওয়ালকটের মতো তিনিও পুরাণকে পুনরাবৃত্তির বদলে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে অনুবাদ করেছেন। বিশেষত ‘অহল্যার প্রতি’ কবিতায় কবি মুক্তির ধারণাকে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।
শ্রম ও জীবন সম্পর্কে কবি নিজের অবস্থানে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ‘কবিতা আসে না’ কবিতায় তিনি মাটির সঙ্গে যুক্ত না থাকা হাতের সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে আত্মজিজ্ঞাসা তুলে ধরেছেন, তা নেরুদা বা নজরুলের শ্রমনির্ভর কবিতার সমান্তরালে এক স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে। কবির ভাষায়, ক্ষত ঢেকে রাখার প্রচেষ্টা থেকেই কবিতার জন্ম হয়।
প্রকৃতি এখানে কেবল দৃশ্যের আধার নয়, বরং অস্তিত্বের অমীমাংসিত রহস্য। ‘মেথির ফলের ঘ্রাণ’-এর মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সংবেদনশীলতা কবিতাকে সুররিয়াল বা পরাবাস্তব আবহ দান করেছে। সব মিলিয়ে, ‘সে এক ফলের ঘ্রাণ’ কাব্যগ্রন্থটি ইতিহাস, প্রেম ও ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকা স্মৃতি ও অদৃশ্য আশীর্বাদের এক শৈল্পিক বয়ান।