ঢাকাTuesday , 28 July 2026
  1. অর্থনীতি
  2. আইন ও বিচার
  3. আন্তর্জাতিক
  4. ইতিহাস
  5. খেলা
  6. খেলাধুলা
  7. চাকরি
  8. জাতীয়
  9. ধর্মীয় সম্প্রীতি
  10. পরিবেশ ও কৃষি
  11. প্রযুক্তি
  12. বিনোদন
  13. বিশেষ প্রতিবেদন
  14. বিশ্ব
  15. ভিডিও
আজকের সর্বশেষ সব খবর

হুমকির মুখে নিঝুম দ্বীপের হরিণ: অস্তিত্ব রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

Truth Post
July 10, 2026 1:28 am
Link Copied!

ড. মো. ফোরকান আলী, গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ

নিঝুম দ্বীপ! চারপাশে অথৈ সমুদ্র, নদীর মোহনা, কেওড়া বন আর হাজারো হরিণের অভয়াশ্রম মিলে গড়ে উঠেছে এক নিঝুম অরণ্য। অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের মানচিত্রে নিঝুম দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক অনন্য দান। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিটি ঐতিহাসিকভাবে ‘চর ওসমান’ নামে পরিচিত ছিল। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই ম্যানগ্রোভ বনটি আজ বাংলাদেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত।

বিভিন্ন তথ্যমতে, সত্তরের দশকে বাংলাদেশের বন বিভাগ এখানে বনায়নের কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৭৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এখানে চার জোড়া হরিণ অবমুক্ত করা হয়েছিল। সেই ক্ষুদ্র সূচনা থেকে বর্তমান সময়ে হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজারে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে সরকার নিঝুম দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান ও হরিণের অভয়ারণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে।

এই দ্বীপের বৈচিত্র্যময় প্রাণিকুলের তালিকা বেশ দীর্ঘ ও চিত্তাকর্ষক। দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

• স্তন্যপায়ী প্রাণী: নখরবিহীন উদবিড়াল ও মেছোবাঘ।
• পাখি: নিশিবক, দেশি কানিবক, গোবক, দেশি পানকৌড়ি, ধূসরবক, কাদাখোঁচা, বালিহাঁস, কালোহাঁস, কোড়া, তিলালালপা ও তিলাসবুজপা।
• সরীসৃপ: দেশি গুঁইসাপ ও নানা প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ।

নিঝুম দ্বীপের মূল আকর্ষণ এখানকার হরিণের পাল, যার সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজারের মতো। তবে হরিণ দেখার জন্য পর্যটকদের এখানে অত্যন্ত নিঃশব্দে চলাচল করতে হয়। সামান্য আওয়াজ বা হইচই শুনলেই হরিণগুলো দ্রুত আত্মগোপন করে বা পালিয়ে যায়। বাংলাদেশে মোট পাঁচ প্রজাতির হরিণের রেকর্ড থাকলেও, এদের মধ্যে হগ ডিয়ার ও সোয়াম্প ডিয়ার প্রজাতি দুটি এখন বিলুপ্ত।

বারকিং ডিয়ার ও সাম্বার ডিয়ারের অবস্থা সম্পর্কে গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান,
“এই দুই প্রজাতির হরিণ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। এদের এখন সিলেটের গভীর বন, কাপ্তাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বান্দরবান এলাকায় কালেভদ্রে দেখা মেলে। তবে স্পটেড ডিয়ার বা চিত্রা হরিণ এ দেশে এখনো বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে।”

বন বিভাগের তথ্যমতে, শুধুমাত্র সুন্দরবনেই চিত্রা হরিণের সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের বনাঞ্চলে এদের দেখা পাওয়া গেলেও নিঝুম দ্বীপে এদের ঘনত্ব সুন্দরবনের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। বাঘের মতো কোনো মাংসাশী প্রাণী না থাকায় নিঝুম দ্বীপে হরিণের বংশবৃদ্ধি খুব দ্রুত হচ্ছে। এদের শারীরিক গঠন সম্পর্কেও কিছু জানা যায়:

• দেহের লালচে বাদামি লোমের ওপর সাদা ফোঁটা দাগ থাকায় এদের নাম ‘স্পটেড ডিয়ার’।
• এদের পেট, গলা, পাঁজরের ভেতরের অংশ, লেজ ও কান সাদা বর্ণের হয়।
• পূর্ণবয়স্ক চিত্রা হরিণের ওজন প্রায় ৮৫ কেজি পর্যন্ত হয়।
• পরিণত বয়সের পুরুষ হরিণের তিন শাখাবিশিষ্ট শিং থাকে।

চিত্রা হরিণ বাংলাদেশের স্থলজ স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও নিরীহ প্রাণী। তবে দিনদিন আবাসস্থল ধ্বংস ও শিকারিদের দৌরাত্ম্যে এদের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। বন উজাড়, গাছ কেটে বসতি স্থাপন, শিয়াল-কুকুরের আক্রমণ এবং রাত-বিরাতে শিকারিদের পাচারকারী চক্রের কারণে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।

নিঝুম দ্বীপে সুপেয় পানির তীব্র সংকট হরিণগুলোকে আরও বিপন্ন করে তুলছে। এখানে কোনো মিঠাপানির পুকুর না থাকা এবং চারপাশে বেড়িবাঁধের অভাবে নোনা পানি বনকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে খাদ্য ও পানির সংকটে হরিণগুলো লোকালয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। দ্বীপের প্রতিকূল পরিবেশ ও বিভিন্ন রোগব্যাধি সম্পর্কে নিম্নোক্ত তথ্যগুলো পাওয়া গেছে:

• বর্ষায় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে খুরা রোগসহ বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
• সুপেয় পানির খোঁজে হরিণগুলো নদী পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী চরে যাওয়ার সময় মারা যায়।
• পুরুষ হরিণ দৌড়ানোর সময় শিং গাছের সাথে আটকে গিয়ে কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়।
• মেয়ে হরিণের মৃত্যুর হার বেশি, কারণ পুরুষ হরিণের শিং পর্যটকদের কাছে বিক্রির জন্য মানুষ নিয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, হরিণের মাথার খুলি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বাচ্চার মৃত্যুহারও উদ্বেগজনক। বাচ্চার হাড় ও মাথার খুলি পর্যবেক্ষণে শিয়াল কর্তৃক বাচ্চা শিকারের প্রমাণ মিলেছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে চিত্রা হরিণ হতে পারে একটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বিশ্বের অনেক দেশে এখন হরিণ ফার্মিংয়ের মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও চিত্রা হরিণের চাহিদা বিশ্ববাজারে ব্যাপক।

পরিশেষে নিঝুম দ্বীপের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত হলো,
“সামান্য প্রচেষ্টায় এখানে ইকোট্যুরিজমের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ব্যতিক্রমী পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। এখান থেকেই হরিণ ফার্মিংয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায়। আমাদের চিত্রা হরিণ অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও এ নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই অবস্থা চলতে থাকলে একটি সম্ভাবনাময় প্রজাতি হারিয়ে ফেলার দায় আমাদেরই নিতে হবে।”