২০১৮ সালে ইতালির জেনোয়া শহরে মর্মান্তিক সেতু ধসের ঘটনায় দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন আদালত। এ ঘটনায় অবহেলা ও নিরাপত্তা ত্রুটির দায়ে ইতালির মোটরওয়ে অপারেটর কোম্পানির সাবেক প্রধান জিওভান্নি কাস্তেলুসিকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ৪৩ জনের প্রাণহানির সেই বিপর্যয় দেশটির অবকাঠামোগত নিরাপত্তার বড় ধরনের ব্যর্থতাকে সামনে নিয়ে এসেছিল।
সংক্ষেপে যা জানা গেছে
- ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট ইতালির জেনোয়া শহরে মরান্দি সেতু ধসে ৪৩ জন নিহত হন।
- অটোস্ট্রেড পার ল’ইতালিয়া (ASPI)-এর সাবেক প্রধান জিওভান্নি কাস্তেলুসিকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
- দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিচার প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা ও জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
- সেতুটি সংস্কারের পরিবর্তে মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
- এই রায় ইতালির অবকাঠামো খাতে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিতে একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
২০১৮ সালের সেই ভয়াবহ বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে জেনোয়ার মরান্দি সেতুটির একটি বড় অংশ হঠাৎ করেই ধসে পড়ে। শত শত ফুট উঁচুতে থাকা সেতু থেকে নিচে পড়ে যায় বেশ কয়েকটি যানবাহন, যা মুহূর্তের মধ্যে এক জাতীয় ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়। এই ঘটনায় প্রাণ হারান ৪৩ জন সাধারণ মানুষ। ঘটনার পর তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, দীর্ঘ সময় ধরে সেতুটির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা জেনেও কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
দীর্ঘ কয়েক বছরের আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালত জিওভান্নি কাস্তেলুসিকে দোষী সাব্যস্ত করে ১২ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, লাভের প্রত্যাশায় জনগণের জীবনের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এছাড়া আরও অনেক সাবেক কর্মকর্তা এবং প্রকৌশলীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়েছে। রায় ঘোষণার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত বিচারের কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
বিশ্লেষণ
জেনোয়া সেতু বিপর্যয় কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না, বরং এটি ইতালির সরকারি ও বেসরকারি যৌথ ব্যবস্থাপনায় চলা অবকাঠামোগত দুর্নীতির এক চূড়ান্ত প্রকাশ। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে যে অবহেলা ও নজরদারির অভাব ছিল, তা এই রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। এই মামলাটি ইতালির বিচার ব্যবস্থায় একটি নজির স্থাপন করেছে যে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে তাদের পরিচালিত প্রকল্পের নিরাপত্তা ত্রুটির জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ থাকবে।
তবে এই রায়ের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে ইতালির পুরো মোটরওয়ে খাতের ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন বেসরকারি খাতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে বাধ্য হবে। এই রায় কেবল যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো অবকাঠামো প্রকল্পে মুনাফাকে জীবনের চেয়ে বড় করে না দেখা হয়, সে বিষয়ে একটি সতর্কবার্তাও বটে।
সূত্র: bbc.co.uk