বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা সুপারবাগের ঝুঁকি মোকাবিলায় নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের গবেষক প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায় ও মো. গোলাম রসুলের মতে, হাসপাতালে বা গবেষণাগারের আধুনিক প্রযুক্তির চেয়েও সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে সাবান ও পানির ব্যবহার বেশি কার্যকর।
এএমআর বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। এর ফলে সাধারণ সংক্রমণও দুরারোগ্য হয়ে ওঠে এবং অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরশীল, যা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের প্রবণতা প্রকট। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু ছয় মাস বয়সের আগেই অন্তত একবার অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছে। এছাড়া অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে সরাসরি কেনা হয়, যা সুপারবাগ সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
সংক্রমণ কমানোর প্রয়োজনীয়তা
অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা তখনই কমে, যখন সংক্রমণের হার হ্রাস পায়। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ফলে ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। সংক্রমণ কম হলে চিকিৎসার প্রয়োজন কমে এবং স্বাভাবিকভাবেই অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর বাড়তি চাপ হ্রাস পায়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যেসব পরিবারে পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত এবং হাত ধোয়ার অভ্যাসের চর্চা আছে, সেখানে শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের হার অন্যদের তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১৪ শতাংশ কম। তবে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই এই অভ্যাসের পরিবর্তন সম্ভব নয়। এর জন্য সামাজিক অনুপ্রেরণা, নজরদারি এবং স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ
এএমআর মোকাবিলায় কেবল ওষুধ নিয়ন্ত্রণ বা সচেতনতামূলক প্রচারই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সংক্রমণ কমানোর একটি জাতীয় কৌশল। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা, স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং পাবলিক টয়লেটের মানোন্নয়নকে একক নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুপারবাগের বিরুদ্ধে লড়াইটি শুরু করতে হবে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বাইরে। হাত ধোয়ার অভ্যাসকে বিলাসিতা নয়, বরং জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো হিসেবে গণ্য করতে হবে। এ অভ্যাস যখন সংস্কৃতিতে পরিণত হবে এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সমর্থন পাবে, তখনই অ্যান্টিবায়োটিকের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।